‘আমার পাগলটাকে দেইখা রাইখো মা’

আহ কি ভালোবাসা, ফুটবলার জাহিদ হোসেন ও অ্যাথলেট লাবণী আক্তার। ছবি: সংগৃহীতশুভ্র কুয়াশার রেণু ফোটানো শীতের ভোর দেখেছেন? উষার আলো ফোটার আগে চারপাশ কেমন আবছা থাকে। কুয়াশার চাদর ভেদ করে একসময় সূর্যের আলো এসে পড়ে গায়ে। কেমন যেন ‘ওম’ লাগে শরীর। শীতের সকালের সেই অনুভূতি অনির্বচনীয়, ভীষণ ভালো লাগার। আচ্ছা, ভালোবাসার ক্ষেত্রেও অনুভূতিগুলো কি একই রকম?

ফুটবলার জাহিদ হাসান হয়তো বলবেন, ঠিক তা–ই। চাইলে লাবণী আক্তারকেও জিজ্ঞেস করতে পারেন একই কথা। এই গোলক নিক্ষেপকারী কিন্তু সুর মেলাবেন তাঁর জীবনসঙ্গীর কথাতেই! ঠিক ধরেছেন। এ দুই ক্রীড়াবিদ বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে একে-অপরের প্রাণ বেঁধেছিলেন ভালোবাসার বাঁধনে।

তিন বছর আগের এক শীতের সকাল। বিকেএসপির অ্যাথলেটিকস ট্রাকে অনুশীলন করছিল জাতীয় ফুটবল দল। ট্রাকে চক্কর দিচ্ছিলেন জাহিদ। হঠাৎ করেই তাঁর চোখ পড়ে পাশের লেনে। দৌড়াচ্ছেন এক নারী অ্যাথলেট। লাবণী আক্তার, এই বিকেএসপিরই মেয়ে। সেদিন চৈত্র মাস ছিল কি না, জাহিদের নিশ্চয়ই মনে নেই, তবে প্রথম দর্শনেই সর্বনাশ বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। প্রেমে পড়েছিলেন লাবণীর।

এরপর প্রেমের চিরায়ত প্রথা মেনেই চলেছে চোখাচোখি। মানে অকারণেই দুজন-দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকা। দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। অনুশীলনে দেখে চোখের সাধ মেটানো। কিন্তু ভালোবাসায় এত অল্পে কি আর মনের সাধ মেটে? হৃদয়ের কাছে হার মেনে অগত্যা জাহিদ সাধ মেটানোর ব্যবস্থাই করলেন।

জাতীয় দলের এ উইঙ্গারের বাসা থেকে তখন বিয়ের চাপ ছিল। জাহিদ তাই দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে নিলেন। পছন্দের মানসকন্যা তো মিলেই গেছে! এখন শুধু সেই মানসকন্যার ‘হ্যাঁ’ শব্দটা শোনার অপেক্ষা। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? ওদিকে জাহিদের মনে প্রেমের সলতে জ্বলছে। সেই আগুন দাউ দাউ করে জ্বালাতে তিনি পেয়ে গেলেন বিকেএসপিরই এক জুনিয়র ফুটবলারকে। সেই ফুটবলারকে দিয়ে জাহিদ পেলেন লাবণীর মুঠোফোন নম্বর, নিজেরটাও দিলেন লাবণীকে।

কোচ ও সতীর্থদের চোখে জাহিদ বরাবরই ‘পাগলা’। কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে জাহিদ ‘ওয়ান টাচ’ খেলোয়াড়। মনের কথাটা খুলে বলতে জাহিদ একদণ্ড সময়ও নেননি। এর নেপথ্যে আরও একটি কারণ ছিল। ঘরে ক্যানসার আক্রান্ত বাবাকে যত দ্রুত সম্ভব দেখাতে হবে বউমার মুখ!

তখন মুঠোফোনে দুজনের প্রেম জমে ক্ষীর। একদিন হাসপাতাল থেকে জাহিদের ফোন পেলেন লাবণী। জাহিদের আবদার, আমার বাবা তোমাকে দেখতে চায়। কিন্তু বিকেএসপি থেকে হুট করে আসা যাবে না। তাই হবু শ্বশুরের সঙ্গে লাবণীর মুঠোফোনেই হলো কথা বলা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জাহিদের বাবা সেদিন লাবণীকে শুধু বলেছিলেন, ‘আমার পাগলাকে দেইখা রাইখো মা।’ এর চার দিন পরই জাহিদের বাবা পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে।

লাবণী বুঝে গিয়েছিলেন, ভালোবাসার পরম বাঁধনে আগলে রাখতে হবে এই ‘পাগলা’কে। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) বেড়ে ওঠা এই দুই হংস-মিথুন তাঁদের প্রেমকে পরিণতি দিয়েছেন ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবরে বিয়ে করে।

জাহিদ সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক কথাই বলা যায়। সামর্থ্যের অর্ধেক প্রমাণ না করেও তিনি দেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার। ২০০৭ সাল থেকেই জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ। কিন্তু খামখেয়ালি মনোভাবের জন্য ফুটবলপাড়ায় ‘পাগলা’ নামে পরিচিত। তাঁর জীবনসঙ্গী লাবণীও সম্ভাবনাময়। দুই বছর আগে শটপুটের (গোলক নিক্ষেপ) সিনিয়র মিটে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। খেলাধুলা থেকে তাঁরা খুব বেশি কিছু পাননি। কিন্তু ভালোবাসা তাঁদের জীবনকে গুছিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে জাহিদের জীবনকে। ভালোবাসা দিবসে সে কথা শুনুন জাহিদের মুখেই, ‘আমার জীবনটা এখন গোছানো। খেলা আর সংসার ছাড়া আর কোনো দিকেই মন নেই।’

তথ্য সূত্রঃ প্রথম আলো